অবহেলিত মুক্তো

রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে। ঘুম ভাঙলো কুকুরের ডাক শুনেই। সারারাত পর কেবল চোখে ঘুম বসেছিল। মোবাইল হাতে নিয়ে বাটনে চাপ দিলাম। তাহাজ্জুতের জন্য দেওয়া এলার্মটা বাজতে এখনো কিছুটা বাকি। আবার কী শোবো? না থাক, সালাতটা আদায় করে নিই।

আজ অনেকক্ষণ কথা হলো রবের সাথে। উনার সাথে কথা বললে এক অদ্ভুত প্রশান্তির স্নিগ্ধতা এসে মনের বিধ্বস্ত বিক্ষিপ্ত সবকিছুকে ছুঁয়ে দিয়ে যায়।

জায়নামাজটা গুছিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। আজ বাতাস নেই মোটেও। কুকুরটা এখনো থেমে থেমে ডাকছে। হঠাৎ ওর সুরটা কেমন জানি করুণ শোনায়। দশ তলার এই বিল্ডিং-এ আমরা থাকি। সপ্তম তলায়। জানালার গ্রিল ভেদ করে দৃষ্টি প্রসারিত করলাম। এখান থেকে কুকুরটাকে দেখা যাচ্ছে না। এদিকটা অবশ্য গলির মতন। একগাদা ময়লার স্তুপে ভরা। চলাচল করে না তেমন কেউ। মাঝে মাঝে টোকাই বাচ্চাগুলো আসে, ওদের বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলোকে কুড়োতে।

-আজ আমায় ডাকলে না যে নীলা! একা একা সালাত পড়ে নিয়েছো?!

ভাবনায় খেই হারিয়ে ফেলায় আমার পিছনে কখন যে আকাশ এসে দাঁড়িয়েছে ঠাহর করতে পারিনি। ওর কপালটা ছুঁয়ে বললাম,

-রাতভর জ্বরে প্রলাপ বকেছো। আলহামদুলিল্লাহ! এখন আর জ্বরটা নেই। শেষে একটু ঘুমিয়েছিলে। তাই আর ডাকিনি। ফজরের জন্য অযু সেরে এসো। আমি জায়নামাজ বিছিয়ে দিচ্ছি।

হঠাৎ কাল কি যে হলো মানুষটার! জ্বরে কাঁপা শরীর নিয়ে সময়ের আগেই অফিস থেকে ফিরে এলো। সারাটা রাত অনেক কষ্ট পেয়েছে। আকাশ ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো আর আমিও জায়নামাজ দুটো সামনে-পিছনে বিছিয়ে নিলাম।

কলিংবেলের আওয়াজে আবারও ঘুম ছুটলো। ফজরের পরে একটু গা এলিয়েছিলাম বিছানায়। সারারাতের ক্লান্ত শরীর! উঠতে একদম ইচ্ছে করছে না। আরেকবার শব্দ হলো। টুং টাং! এমন সময় কেউ আসে না সচারাচর।

-কে?

-আমি, ভাবী!

কন্ঠটা পরিচিত। পাশের ফ্ল্যাটের পারভিন ভাবী। ভদ্রমহিলা এমন সময় কখনোই নক করেননি কোনোদিন। তড়িঘড়ি দরজাটা খুলে দিলাম।

-কী হয়েছে ভাবী?!

-কী দিনকাল এসে গেল ,ভাবী। কত কী যে আর দেখবো! আল্লাহ ভালো জানেন।

উনার কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে কথা বলার ধরণ দেখে আন্দাজ করলাম খারাপ কিছুই একটা নিশ্চয়।

-আপনার কথার কিচ্ছুটি বুঝছি না। ভিতরে আসুন তো। বসুন।

-না বসবার সময় নেই। কী কান্ড হয়েছে নিচে গিয়ে একবার দেখে আসুন। একটা মরা বাচ্চা পড়ে আছে গলির ভেতর। কার পাপ কে জানে!

শেষের কথাটা যেন কী বললেন? বাচ্চা! হ্যাঁ, বাচ্চাই তো বললেন!

-কে নীলা, কী হয়েছে?

-এক্ষুণি নিচে যাবো! চলো।

-কী হয়েছে বলবে তো! আর এমনই বা করছো কেন?

-আগে নীচে চলো। তাড়াতাড়ি করো।

আচানক আমার এমন উদ্বিগ্নতা দেখে একটু ঘাবড়ে গেল ও। কথা না বাড়িয়ে চটজলদি তৈরি হয়ে নিলো।

গলির মধ্যে বেশ জটলা পাকিয়ে গেছে। ভেতরে যাবার রাস্তা নেই। এতক্ষণে লোকমুখে আকাশ‌ও ঘটনা জেনে গেছে। হঠাৎ হাতটা ধরে হ্যাঁচকা টানে আমায় খানিক ফাঁকা জায়গায় সরিয়ে নিয়ে এলো। করুণ চোখে বলল,

এখানে আমাদের কিছু দেখার নেই, নীলা। ফিরে যাই চলো, প্লিজ।

আমিও সাত বছরের তৃষ্ণার্ত চোখ নিয়ে বললাম,

একবার শুধু, একটিবার! আমার খুশির জন্যে…

আমার খুশির জন্য আকাশ সবসময়ই তার আয়ত্বের সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অবশেষে বাচ্চাটা আমার চোখের সামনেই । দারুণ মায়াভরা চেহারা। নাভির নাড়িটা দিয়ে একটা পা জড়ানো। মাছিরা সারা শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন আদর দিয়ে যাচ্ছে। আমিও ছুঁইয়ে দিলাম ওর নীলাভ কোমল মসৃণ ত্বকটা। এই ছোট্ট মাসুম বাচ্চাটার জন্য‌ই কাল রাতে কুকুরটা বুঝি ওমন করে ডাকছিলো।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি আমি আর আকাশ। যখন ভালো একটা বিদেশী এনজিওতে চাকরি হয়ে যায় ওর, তিন বছরের প্রেমের সম্পর্কটাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করি আমরা। বিয়ের চার মাস পর আমিও একটা চাকরি পেয়ে যাই।

নতুন জীবন। নতুন স্বপ্ন। হাজারো সুখ পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ সাজাতে লাগলাম দুজনে। একদিন অনুভব করলাম আমার অস্তিত্বের মাঝে আরেকটা অস্তিত্বকে। আমাদের প্রথম সন্তান। খুশি হবার কথা ছিলো। কিন্তু আমরা খুশি হতে পারিনি।

আকাশ বলেছিল, এতো তাড়াতাড়ি নয়। এখন লাইফটাকে গোছানোর সময়, দায়িত্ব নেওয়ার নয়। আমাদের ক্যারিয়ার তো এখনো পড়েই আছে! আমিও ওর কথায় একাত্মতা প্রকাশ করেছিলাম। আমার অস্তিত্বের সাথে লেপ্টে থাকা মাসুম জানটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম।

বিয়ের চার বছর পর দু’জনে ভাবলাম, এতোদিনে আমাদের কাঁধ পাকাপোক্ত হয়েছে। ক্যারিয়ার‌ও গোছানো। দায়িত্ব নেওয়া যায়। এখন সময় এসেছে- একটা ছোট্ট পাখি চিঁ চিঁ করে পুরো ঘরময় ওড়াউড়ি করার। কিন্তু মাস যায়, যায় বছর। ধরনীর কোলে বসন্ত আসে, ফুল বাগানে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত করে রাখে তার পুরোটা উঠোন। শুধু আমার কোল চৈত্রের তাপদাহে চৌচির হওয়া মৃত্তিকার মতন রয়ে যায়।

পাখিরা তো আসে। ওদের নাজুক নাজুক ডানায় ভর করে। নরম তুলতুলে গাল দিয়ে আমাদের ছুঁয়ে দিতে। যে ডাক শুনলে নারীত্বের পূর্ণতা মিলে, সেই ডাকের নেশায় মাতাল করে রাখতে। কিন্তু আমি? আমরা?

আমার মতো কতশত জনের ক্যারিয়ার থাকে, থাকে আকাশচুম্বী স্বপ্ন। আবার, কার‌ও ক্ষণিকের আবেগে করা ভুল! আর‌ও না জানি কত কারণে; উঁহু অকারণে- সেই পাখিগুলোকে বড় নিষ্ঠুর, নির্মমভাবে শেষ করে ফেলি। পৃথিবীর অদৃশ্য আদালতে এর কোনো ‌বিচার হয়না, হবেও না। কিন্তু, আমি তো ধুঁকে ধুঁকে মরি। খুনির তালিকায় আমার নামটা জ্বলজ্বল করে। আমার চোখ ঝলসে যায়, আমার হৃদয় কার্বন হয়ে অনন্ত পোড়ে…

মা। যে শব্দ সবচে’ মায়ার, যে নামের মাঝে নারীসত্ত্বার অস্তিত্ব লুকিয়ে থাকে, সে নামের গায়েই পরম খুশিতে বিনা অপরাধবোধে নিজ হাতে কালি মেখে কলঙ্কিত করি আমরা। বড্ড বেশি ঘৃণা হয় নিজের উপর। আজ সাতটা বছর ধরে নির্লজ্জের মতো অধীর অপেক্ষায় আছি। কেউ আমায় ‘মা’ বলে ডাকবে। আধো আধো বুলিতে আহ্লাদ করে শত আবদার করবে। প্রতিরাতে আমি খুশিয়াল গলায় ওর জন্য গান গাইবো। ও চুপটি করে ঘুমুবে। আর সারাটাদিন দুষ্টুমিতে আমার গোছানো ঘরটাকে অগোছালো করে ফেলবে। আমার পা দু’টো ওর পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আমি তবুও ওকে চাই…

আমাদের ঠিক নিচতলার ফ্ল্যাটে জেসমিন ভাবী থাকেন। উনার খুব ধার্মিক একটা পরিবার। ছোট ছোট তিন তিনটে বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ওখানে গেলেই যেন কলিজা শীতল হয়ে আসে। আমাকে দেখা মাত্রই তিনটেতে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। কে আগে ছুঁয়ে দিবে আমায়!?

আলোচনা প্রসঙ্গে একদিন জেসমিন ভাবী বললেন,

যিনি ডাক্তারদেরও নিরাময় করেন তাঁকে কি জানিয়েছেন নিজের অভিপ্রায়ের কথা?

-না তো, কে তিনি? আপনি চেনেন? ঠিকানা আছে আপনার কাছে?

মুচকি হেসে একগাদা বই হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন-

সব প্রশ্নের জবাবে এই বইগুলোতে আছে‌। আল্লাহ্ চাহেন তো জলদি আপনার চোখের কষ্টের পানির ফোঁটাগুলোকে সুখের ঝর্নায় পরিবর্তন করে দেবেন, ইন শা আল্লাহ্।

তিন মাস হতে চললো। আমি আমার রবকে চিনেছি। জেনেছি ওনার অদ্ভুতভাবে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা। তাই, প্রতিরাতে মেঘেরা চোখের কোনে ভিড় জমায়, ঝরায় অশ্রুপ্লাবন। প্রতিটি জলকণায় মিশে থাকে অনুশোচনা, অনুতাপ, আর তাঁর অফুরন্ত নিয়ামাহর ভাণ্ডার থেকে একটুকরো অংশ পাওয়ার অধীর আকাঙ্ক্ষা। জানি, প্রভু নিরাশ হতে বারণ করেছেন। তাইতো নিরাশার ঘরে আশার প্রদীপটি মিটি মিটি জ্বলে- সে আলোয় আমি আমার অবহেলিত মুক্তোকে দেখতে পাই। আমার হয়তো স্মৃতিভ্রম হয়। সে আমায় অস্ফুট স্বরে বলে- আমি আবার এসেছি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *