পুতুল

বহুকাল বাদে একখানা গল্প তুলেছি আজ। এটাকে গল্প বলবো নাকি কিছু শব্দের অবাধ্য ছুটোছুটি, জানি না। তবে যাই হোক, নায়িকা কিন্তু আমি নই। আমি কখনোই কোনো গল্প কিংবা কবিতার নায়িকা হইনি। আমার কাঁচের চুড়িরা বরাবরই ভেঙেছে। আমার হাতের রেখায় চিরকালই অশান্ত রক্তের স্রোত বাসা বেঁধেছে।


খুব খুব ছোটবেলায় বাবার কাছে চেয়েছিলাম এক পুতুল বর। বাবা আমার বায়না মিটিয়েছিলেন। আমার সব বায়নাই মেটাতেন তিনি। একজোড়া পুতুল বর-বউ নিয়ে আমি মেতেছিলাম খুব, খেলেছিলাম প্রচন্ড উচ্ছলতায়। হঠাৎ একদিন সেই বউ কি জানি কোন্ মরা অভিমানে কই হারালো!


আমার রাগ হলো ভীষণ। বউ একলা হারায়, ওদিকে বরমশাই চুপচাপ পড়ে থাকে। পুতুলের কাজই বুঝি এই!
“তবে চাই না এমন পুতুল বর”— এই বলে মহা আক্রোশে জানালা দিয়ে দূরে ছুড়েছিলাম সেই পঁচা পুতুল।


তারপর পেরিয়েছে এক যুগ কিংবা তারও বেশি। আমি আর কখনও কোনো পুতুল চাইনি।
বান্ধবী তরুলতার বিয়ে হলো এই ক’মাস আগে। আমার অবুঝ কালের প্রাণের বান্ধবী। আমি কি আনন্দে সেজেগুজে হাজির হয়েছিলাম সেখানে! উপহার দিয়েছিলাম আস্ত একটা ঘর আর ঘরের চাবি। বান্ধবী আমার খুব হেসেছিলো সেদিন। দূরে নায়কের ভঙ্গিতে বসে থাকা ওর বর দেখেছিলাম। ঝলমলে আলোতে ঘেরা টুকটুকে বর। কারা যেনো আচমকা এসে তরুকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললো, “কি রে তরু, খুব তো পুতুল পুতুল বর পেয়েছিস! ভুলে যাস না যেনো আমাদের।”


আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। ছুটে পালিয়ে এসেছিলাম বিয়েবাড়ি থেকে। এক রাস্তা গাড়ি-ঘোড়া পেরিয়ে দৌঁড়েছিলাম লাগামহীন উন্মত্ত ঘোড়ার ন্যায়। আমার স্যান্ডেল জোড়া ছিঁড়ে হারিয়েছিলো এদিক ওদিক। দিনশেষে রক্তাক্ত পা ধূলায় মাড়িয়ে পৌঁছেছিলাম আমার ছোট্ট ঘরে। নড়বড়ে চৌকিতে বসে ভেবেছিলাম কতো কি!


কিছুকাল পর কি যেনো হয়! ছাদের এক কোণে আদরে পেলেপুষে বড় করা আমার পায়রার দল সজোরে ডানা ঝাপটে কোথায় যেনো উড়ে যায়। যায় তো যায়ই, আর ফেরে না! আমি অপেক্ষায় মরি সারাবেলা। আমার বুক জুড়ে বিশাল আসমানের ন্যায় হা-হুতাশ বাসা বাঁধে। খবর আসে, তরু নেই! আমি জ্ঞান হারাই।

২৯ অক্টোবর, ২০১৯
ভোরের আলো ফুটবার আগেই তরুলতা ফাঁস নেয়। আগেরদিন বরের সাথে এক চিলতে সুখের মুহূর্ত কাটাতে বেরিয়েছিলো সন্ধ্যাবিলাসে। মানুষের চেহারায় একদল বুনো শুয়োর হামলা করেছিলো আমার নিষ্পাপ তরুকে। ওর নায়ক নায়ক পুতুল বরটি কর‍তে পারেনি কিছুই। কেবল কেঁদে কেঁদে তরুকে হাসপাতালের বিছানায় শুইয়েছিলো।


অনেকদিন কেটেছে তারপর। রাস্তায় বেরোলে প্রায়ই দেখি তরুর বর হেঁটে যায়। তরুর জায়গা নিয়েছে অন্য কেউ। ভালোই আছে তারা। মরেছে কেবল তরুই। মরেছে ওর সমস্ত সম্ভ্রম হারানোর বেদনায় কিংবা কি জানি কোন্ ক্ষোভে!


সেবার গাল ফুলিয়ে বাবাকে বলেছিলাম, “বাবা, আমার একটা মানুষ চাই।”
বাবা হেসেছিলেন খানিক। মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলেছিলেন, “পাগলি বুড়ি”। আমি লজ্জায় দু’হাতে মুখ ঢেকেছিলাম।


বাবা ঘটা করে আমায় এনে দিয়েছিলেন এক মস্ত মানুষ। আমি ঘোরলাগা চোখে ঘাড় উঁচিয়ে তাকে দেখেছিলাম খুব। কাছে গিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে তার বাহুখানা জড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, “তুমিই বুঝি আমার সেই মানুষ?”
সে আমার দিকে চেয়ে যেনো এক জন্মের ভরসা ঢেলে দিলো। বললো, “আমি তোমার, কেবল তোমারই মানুষ।”


মানুষ পাওয়ার খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলাম আমি। সমস্ত না পাওয়া ভুলে হেসেছিলাম তরুর মতো। আমার ঘরের দেয়াল সেজেছিলো কতো রঙে! হাত জড়ানো কাঁচের চুড়িরা বেজে উঠেছিলো টুংটাং। তারপর কী হলো!


আমার পালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর পায়রাটি ঠোঁটের ফাঁকে রক্তমাখা রুমাল গুজে ফিরে এলো নতুন ছাদে। খুশি হওয়ার বদলে আমি চমকে উঠলাম। চিৎকার করে আমার মানুষকে ডাকলাম। সে এলো। আমি কাঁপা গলায় বললাম, “ভয় পাচ্ছি খুব। তুমি আছো তো?”


সে আবারও আমার হাত চেপে ভরসা দিলো। বললো, “আমি তোমার, কেবল তোমারই আছি।”


ভালো করে দেখলাম তার দিকে। ছোটবেলায় বাবার কিনে দেয়া পুতুল বরের মতোই মুখখানা তার। তবে কি…?

প্রচন্ড ভয়ে কুকড়ে আলগোছে তার হাত ছেড়ে দিলাম আমি।
তারপর একদিন, আমার ঘরেও আগুন জ্বললো দাউদাউ। আমার সাধের দেয়াল জুড়ে পড়লো ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। তরুর মতোই আমিও ভোরের আলো ফুটবার আগে হারিয়ে গেলাম।


না না, গলায় দড়ি দেইনি। সবাই কি তাই করে? বরং কারও কারও কাছে এই পাড়ের এক জীবনের চাইতে পরকালই প্রাধান্য পায়।
আমার মানুষ কিংবা পুতুল বর আমায় বাঁচায়নি। কিছুই করতে পারেনি কেউ। পুতুলেরা বুঝি তবে এমনই হয়! নাকি আমিই ছিলাম জন্মের কপাল পোড়া? জানি না। উত্তর পাবার আগেই আমি চলে এসেছিলাম শত আলোকবর্ষ পেরিয়ে।


আর তারপর—
মড়ক লাগার আগেই
কী ভীষণ চুপিসারে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম!
হারিয়ে বেঁচেছিলাম
মস্ত চোরাপথ এড়িয়ে।

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *