লেখক হতে হলে – ০১

ডিসক্লেইমারঃ
[ ১. লেখালেখি রপ্ত করার কল-কব্জা সম্পর্কিত এই সিরিজ। কথাগুলো আগাগোড়া আমার মস্তিষ্কপ্রসূত, তাই এতে যে সবাইকেই একমত হতে হবে, এমন নয়।
২. এই সিরিজে আমি বেশ অনেক সেক্যুলার লেখকদের রেফারেন্স ব্যবহার করবো। তাদের উদ্ধৃতি টেনে আনবো। কল-কব্জা বর্ণনার খাতিরেই আনতে হবে। তাই, অতি উৎসাহি হয়ে আমাকে কোন ট্যাগ না দিলে খুব খুশি হবো। ]


ছোটবেলায় আমরা কতো হাজারবার-ই শুনেছি, ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’, তাইনা? কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, বারংবার শোনা, শুনতে শুনতে বড় হওয়া এই কথাগুলো কতোখানি সত্যি? আমি বলে দেই, এই কথাগুলো নব্বইভাগ মিথ্যা। দশভাগ সত্য এই কারণে যে, পড়ালেখাকে নিয়ামক করে অনেকেই জগতে গাড়ি-ঘোড়ার মালিক হয়েছে বটে। তবে, সার্টিফিকেটধারী বেকারের সংখ্যার তুলনায় সেই হিশেব নিতান্তই নস্যি।


কিন্তু, আজ আমরা গাড়ি-ঘোড়া লাভের উপায় নিয়ে কথা বলবো না। আমরা আজ কথা বলবো লেখালেখির কলা-কৌশল নিয়ে। কলা-কৌশল নিয়ে আলাপের আগে তাই এই প্রসঙ্গটা টেনেছি যাতে একটা বিষয়ের মাঝে আপনাদেরকে টেনে আনা যায়।
‘পড়ালেখা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’- এই সুন্দর, অর্ধসত্য কথার পাশাপাশি, আপনি আরো একটা কথা হয়তো-বা অনেক অনেকবার শুনে থাকবেন। বিশেষ করে আপনি যদি লেখক হবার বাসনা মনে পোষণ করেন, এবং এই তাড়না থেকে কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক, যিনি লেখালেখি করে নামডাক কুড়িয়েছেন, কিংবা আপনার জানামতে যার লেখার হাত খুব ভালো, তাকে যদি জিজ্ঞেস করে থাকেন, ‘ভাই, লেখালেখি করতে মন চায়। কিভাবে ভালো লেখালেখি করা যায়, বলুন তো?’


আপনার এমন সরল, সোজা আর সহজ প্রশ্নের উত্তরে তিনি আপনাকে সর্বপ্রথম যে উপদেশটা দিয়ে থাকেন, তা হলো- ‘ভালো লিখতে হলে অনেক বেশি পড়তে পড়তে হবে’


বলাই বাহুল্য, লেখালেখি শেখার প্রাক্কালে লেখকদের কাছ থেকে এই এক উত্তর শুনতে শুনতে আপনি হয়তো-বা ক্লান্ত, বিরক্ত। ভাবতে পারেন, ‘এই এক মুখস্ত উত্তর ছাড়া এদের ঝুলিতে কি আর কিছু নেই?’


‘ভালো লিখতে হলে অনেক বেশি পড়তে হবে’- বারংবার এই নীতিবাক্য শুনতে শুনতে আপনি ধরেই নিয়েছেন, এটা একটা মিথ্যা, বোগাস কিংবা উপরের ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’ জাতীয় শান্তনাবাক্যের মতোই অর্ধসত্য জিনিস, তাইনা?


কিন্তু, আমি আপনাকে হলফ করে বলতে পারি, লেখকেরা আপনাকে এই উপদেশ, এই নীতিবাক্য জেনে বলুক কিংবা না জেনে, বুঝে বলুক কিংবা না বুঝে, বিরক্তি কিংবা দায় এড়াতে, যে কারণেই বলুক, এই কথা একশতো ভাগ সত্য।


‘ভালো লিখতে হলে অনেক বেশি পড়তে হবে’- এই কথাটাকে আপনি আপনার শোবার ঘরের দেয়ালে, পড়াশুনা করার টেবিলের পাশে, কিংবা যেখানেই হোক, দৃষ্টির কাছাকাছি, পাশাপাশি বড় করে লিখে টানিয়ে রাখতে পারেন, যদি আপনি সত্যিকার অর্থেই ভালো লেখক হতে চান, ভালো লিখতে চান। কারণ, ভালো লিখতে হলে যে অনেকবেশি পড়তে হবে, এই জিনিসটা আপনার বারবার মনে পড়া দরকার। তাহলেই আপনি একটা তাড়না অনুভব করবেন পড়ার। মোবাইল হাতে না নিয়ে, বই হাতে নিবেন।


অনেকবেশি পড়লে যে কেবল লেখার হাত পাকবে, তা কিন্তু নয়। অনেকবেশি পড়লে আপনি নিজেও অনেকবেশি সমৃদ্ধ হবেন। অনেক বেশিই জানতে পারবেন। কথিত আছে, টলস্টয়কে (বা, এই ঘরানার অন্য কেউ) একবার তরুণদের জন্য তিনটে উপদেশ দিতে বলা হলে, টলস্টয় বলেছিলেন- ‘পড়ো, পড়ো এবং পড়ো’।


আর, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিল হওয়া বাক্যই হলো- পড়ো। পড়ার মাধ্যমেই একটা বিপ্লব, একটা বোধ-বিস্ফোরণ সম্ভব।


যদি ভালো লেখক হতে চান আপনাকে অবশ্যই অনেকবেশি পড়তে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। পৃথিবীতে দুয়েকজন হয়তো-বা অনেকবেশি না পড়েও অনেক ভালো লিখে বিখ্যাত হয়ে আছেন। কিন্তু, ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হয়না জেনেই আপনাকে আগাতে হবে। অনেক বেশি পড়ার জন্য দরকার একটা ইস্পাত-কঠিন সংকল্প। এই সংকল্প যারা নিতে পারে, তারা অনেক ভালো লিখতে পারে, অনেক ভালো বলতে পারে, অনেক ভালো ভাবতে পারে। তাই, পড়ুন, পড়ুন এবং পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *