লেখক হতে হলে – ০২

‘ভালো লিখতে হলে অনেকবেশি পড়তে হবে’- তা আমরা আগের পর্বে বলেছিলাম। কিন্তু, কেনো আপনাকে পড়তে হবে বলুন তো? জানার জন্যে? অনেকবেশি পড়লে অনেকবেশি জানবেন, তা তো জানা কথা-ই। কিন্তু, কেবল অনেকবেশি জানলেই কি অনেক ভালো লিখতে পারবেন?

উত্তর হচ্ছে – ‘না’।

ভালো লিখতে পারার জন্যে দরকার ভালো লেখনশৈলী। আপনি যতো-ই জানুন না কেনো, সেগুলোকে যদি পাঠোপোযোগিতার রূপ দিতে না পারেন, যদি সেগুলোকে সুন্দর শব্দ গাঁথুনির মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে আপনি ভালো পাঠক-ই রয়ে যাবেন দিনশেষে, ভালো লেখক আর আপনার হয়ে উঠা হবেনা।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন বাড়ি নির্মাণ করার জন্যে আপনি বাজারের সবচেয়ে সেরা ইট নির্বাচন করেছেন। ইটগুলোকে এনে আপনার উঠোনে স্তুপাকারে সাজিয়েও রেখেছেন। বলুন তো, সবচেয়ে ভালো ইট আর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখার কারণেই কি আপনার বাড়ি তৈরি হয়ে যাবে? অবশ্যই না। ইটগুলোকে সুন্দর গাঁথুনির মাধ্যমে, পর্যাপ্ত ভালো সিমেন্ট, ভালো মানের লোহা সহ যাবতীয় উপাদানের সম্মিলিত ব্যবহারের মাধ্যমেই তৈরি হবে আপনার ইমারত।

লেখালেখির ব্যাপারটাও ঠিক এমন-ই। আপনি অনেকবেশি জানেন, কিন্তু সঠিক শব্দচয়ন, যথাযথ বাক্যগঠন না জানলে সেই জানাগুলোকে পাঠোপোযোগিতার রূপ দেওয়া যাবেনা।

এই যে সঠিক ‘শব্দচয়ন’, যথাযথ ‘বাক্যগঠন’, এগুলো আপনি কিভাবে রপ্ত করবেন? আগের মতোই। বই পড়ে। আপনি যতোবেশি পড়বেন, ততোবেশি শব্দের সদর দুয়ার আপনার সামনে উন্মোচিত হবে। যতোবেশি বইয়ের মাঝে ডুব দিতে পারবেন, ততোবেশি ইমারত তৈরির ক্রিয়া-কৌশল আপনার আয়ত্ত্বে আসবে। এটাই হচ্ছে মূল এবং সারকথা।

আমার মনে হয়, একজন ভালো লেখকের মাঝে দুটো প্রধান মুন্সিয়ানা বিদ্যমান থাকে। প্রথমটা হলো, শব্দ নিয়ে খেলা করতে পারার ক্ষমতা। আর দ্বিতীয়টা হলো বর্ণনার সাবলীলতা।

শব্দ নিয়ে খেলতে পারার ক্ষমতা যার মাঝে আছে, লেখক হয়ে উঠার সবগুলো গুণ তার মাঝে আপনাআপনি তৈরি হয় বলেই আমার বিশ্বাস। শব্দ নিয়ে খেলাটা তাহলে কি?

কোন একটা ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে আপনি যতোবেশি নতুন, কিন্তু পরিচিত শব্দ ব্যবহার করবেন, ততোবেশিই প্রকট হবে আপনার যোগ্যতা। খেয়াল করবেন, আমি বলেছি ‘নতুন’ কিন্তু ‘পরিচিত’। নতুন আবার পরিচিত হয় কিভাবে? বা, পরিচিত-ই বা নতুন হবে কি করে, এটাই ভাবছেন হয়তো-বা, না?

ধরুন, আমি লিখলাম, ‘তুমুল বৃষ্টির ফলে গ্রামটা ডুবে গেছে প্রায়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোন গাছের গুঁড়ি ভেসে আছে পানির ওপর’।

আমার এই লেখা আপনি পছন্দ করলেন না। কথাটুকুতে আপনি আরেকটু সাহিত্য সাহিত্য ভাব আনতে চান। আপনি লিখলেন-

‘বর্ষার অবিরাম ধারায় তলিয়ে গেছে গ্রামটি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন নদীর বুকে একখানা ডুবন্ত চর, কোনোমতে মাথা উঁচিয়ে আসন্ন ভাঁটার জন্য অপেক্ষা করে আছে’।

আপনার এবং আমার, দুজনের বক্তব্যই কিন্তু এক। একই জিনিস, একই আবহ, একই দৃশ্যপট বর্ণনা করার চেষ্টা আমরা দুজনেই করেছি। কিন্তু, পড়ে মনে হচ্ছে, আমার বর্ণনাটা কেমন জানি সাদামাটা, আর আপনার বর্ণনাটা কেমন প্রাণোচ্ছল, প্রাণবন্ত, তাইনা?

আমি ব্যবহার করেছি, ‘তুমুল বৃষ্টির ফলে’, আর আপনি ব্যবহার করেছেন ‘বর্ষার অবিরাম ধারায়’। দুটো একই ঘটনা। তুমুল শব্দের বদলে আপনি ‘অবিরাম’ বেছে নিয়েছেন, ‘বৃষ্টির’ বদলে ‘বর্ষা’। এবং, পানির প্রবাহটাকে যুতসই একটা রূপ দিতে আপনি সাথে জুড়ে দিয়েছেন ‘ধারা’ শব্দটি।

আচ্ছা, আপনি যা লিখলেন, তাতে কি কোন অপরিচিত শব্দ আছে? নেই কিন্তু। এই শব্দগুলোকে আমরা চিনি। তবুও, সেগুলো আলাদা আবেদন তৈরি করলো কেনো? কারণ, ব্যবহার এবং বৈচিত্র‍্যের দিক থেকে ‘তুমুল বৃষ্টি’ আমরা কথায় এতো বেশি ব্যবহার করি যে, সেটা শুনলেই আমাদের কাছে সাধারণ সাধারণ মনে হয়। কিন্তু সেই তুলনায় ‘অবিরাম বৃষ্টি ধারা’ এই শব্দগুলোকে আমরা সাধারণত বইয়ের পাতায়, গল্প-উপন্যাস কিংবা কবিতায় দেখে থাকি। যার ব্যবহার যেখানে যুতসই, তাকে সেখানে থাকতে দিলেই তার ভাব গভীর হয়ে ধরা দেয়।

শব্দ নিয়ে খেলা করতে পারা এবং বর্ণনার সাবলীলতার দুটো প্রকৃষ্ট উদাহরণ দিয়ে এই লেখাটাকে সমাপ্ত করে দিতে চাই। আমার খুব প্রিয় একজন সাহিত্যিক আবদুল আযীয আল আমান তাঁর ‘যখন মুক্তি’ গল্পের শুরুটা করেছিলেন এভাবে-

‘খিদে মেটানো সোলেমানপুরের দিগন্ত ছোঁওয়া মাঠের মতো মনে হয় তাঁকে। বলয় বিছানো সবুজ, ভরা ফসলের গৌরব, সুবহে সাদিকের বিস্ময়কর উর্বরতা, কাকলিমুখর ব্যস্ত ওড়াওড়ি, আসন্ন সন্ধ্যার বিপুল বর্ণময়তা- এমন পর্যাপ্ত আহারেরও অধিক যেন তিনি। পাথর যেমন পাহাড়ে নিশ্চিন্ত, নক্ষত্র যেমন আকাশে নিরিবিলি- প্রতিটি ভাপওঠা হৃদয়কে, মাযলুমী প্রতিটি আত্মাকে তেমনি তিনি নিরাপদ কোল দিয়েছেন’।

লেখাটুকু খেয়াল করুন, এবং লেখকের লিখনশৈলী! শব্দের যে কারুকাজ তিনি বুনন করেছেন এইটুকুতেই, তা কতো চমৎকার দেখুন। একেই বলে শব্দ নিয়ে খেলতে পারার ক্ষমতা!

‘খিদে মেটানো সোলেমানপুরের দিগন্ত ছোঁওয়া মাঠ’

‘বলয় বিছানো সবুজ’

‘ভরা ফসলের গৌরব’

‘সুবহে সাদিকের বিস্ময়কর উর্বরতা’

‘কাকলিমুখর ব্যস্ত ওড়াওড়ি’

‘আসন্ন সন্ধ্যার বিপুল বর্ণময়তা’

‘পাথর যেমন পাহাড়ে নিশ্চিন্ত’

‘নক্ষত্র যেমন আকাশে নিরিবলি’

এই যে, কতো পরিচত শব্দগুচ্ছ, অথচ সেগুলোকে এমন উপমায় প্রকাশ করেছেন লেখক, যা হয়ে উঠেছে অনন্য, অসাধারণ!

প্রিয় কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘পুলিনবিহারী’ প্রবন্ধের শুরুটা এভাবে করেছেন-

‘ছেলেবেলায় যে-রকম গলাজল ঠেলে ঠেলে খাল পেরতুম, ঠিক সেই রকম পূবের হাওয়া ঠেলে ঠেলে সমুদ্রপারে পৌঁছতে হলো। অন্য দিন সমুদ্র থেকে এক একখানা করে ঢেউ পাঠায়। সে অনেক দূর থেকে, পাঁয়তারা কষে কষে, দড়ি পাকিয়ে পাকিয়ে, কোমর বেঁধে শেষটায় পাড়ে এসে আছাড় খায়। আজ বিশাল আয়োজন। একসঙ্গে অনেকগুলো পালোয়ান, একজনের পিছনে আরেকজন পাঁয়তারা কষে কষে আসছে। তারপর পাড়ে এসে হুটোপুটি- দোস্ত দুশমনের সনাক্ত হওয়ার গোলমালে আপসে হানাহানি। শেষটায় কোলাকুলিতে মিলে গিয়ে ছোট দ’য়ে জমে যাওয়া’।

কোনো একদিনের সমুদ্র দেখার বর্ণনা দিয়ে লেখক তার লেখা শুরু করেছেন। সেই বর্ণনায় বাহুল্যতা নেই, বাগাড়ম্বরতা নেই। সাবলীল বর্ণনা, সাথে লেখকের স্বভাবসুলভ হাস্য-কৌতুক। এখানেই একজন লেখকের সত্যিকার মুন্সিয়ানা। তার নিজের বৈশিষ্ট্যে তিনি সর্বদা, সমান উজ্জ্বল।

এই যে লিখতে হলে শব্দ নিয়ে খেলতে পারার ক্ষমতা, এবং বর্ণনার সাবলীলতা, এগুলো রপ্ত করবার উপায় কি? উপায় একটাই- পড়া।

যতোবেশি পড়বেন, ততোবেশি আপনি নতুন নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হবেন যা আগে জানতেন না, কিংবা জানতেন না তাদের ব্যবহার। যতোবেশি পড়বেন, ততোবেশি বর্ণনার নতুন নতুন ধারা, নতুন নতুন শৈলীর দেখা পাবেন আপনি যা আপনাকে আস্তে আস্তে সমৃদ্ধ করবে। এরপর, যখন লিখতে যাবেন, সেই শব্দগুলো, বর্ণনার সেই ধারাগুলো আপনার সামনে মেলে ধরবে তাদের বিস্তৃতি। সেগুলোকে নতুন রূপ আর কাঠামোয় ফেলে, আপনি তৈরি করে নিতে পারবেন আপনার নিজের বৈশিষ্ট্য, যে বৈশিষ্ট্য হবে একান্তই আপনার নিজস্ব। তাই, পড়ুন। অনেক বেশি পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *