লেখক হতে হলে – ০৩

ছোটবেলায় গরুর রচনা আমরা কে না লিখেছি। প্রাইমারি পাশ করে আসা আমাদের প্রত্যেককে বাধ্যতামূলকভাবে গরুর রচনা শিখতে এবং লিখতে হয়েছে।

আমরা লিখেছি, গরু একটি চতুষ্পদ গৃহপালিত প্রাণী। গরুর চারটি পা, দুটি শিং, দুটি চোখ, একটি নাক এবং দুটি কান আছে। গরু আমাদের দুধ দেয়…

আমরা সবাই মোটামুটি এভাবেই গরুর রচনা লিখতে সিদ্ধহস্ত ছিলাম, কারণ- আমাদের মাস্টারমশাই, আমাদের শিক্ষকেরা আমাদেরকে এভাবেই লিখতে শিখিয়েছেন। তারা গরুর রচনার যে ধারা আমাদের তৈরি করে দিয়েছেন, তার বাইরে গিয়ে, নতুন ধারায় কোনোকিছু লেখার মতোন সাহস কিংবা স্বাধীনতা- কোনোটাই আমাদের ছিলো না।

কিন্তু, নতুন ধারায় কোনোকিছু লিখতে গেলে দরকার নতুন ভাবনার। ও’বয়সে আমরা যেহেতু নতুন ভাবনা-চিন্তা করায় পারদর্শী ছিলাম না, তাই আমরা সেই গতানুগতিক, চলে আসা ধারাতেই লিখে এসেছি সেই সুবিখ্যাত গরুর রচনা।

তবে, এখন যদি কেউ আমাকে গরু নিয়ে কিছু লিখতে বলে, আমি অবশ্যই অবশ্যই আমার মাস্টার মশাইয়ের তৈরিকৃত ধারার আশপাশ দিয়েও ঘেঁষবো না। কারণ আমি জানি, ও ধারায় নতুনত্ব নেই, চিন্তার প্রসারতা নেই, মৌলিকত্ব নেই। ভাবনা-চিন্তায় আমি যেহেতু ও’বয়সের চাইতে এখন অনেক বেশি ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধ, তাই, আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে, একেবারে নতুন কোন ধারা তৈরি করা, যা হবে একান্তই আমার নিজস্ব।

আমরা যারা লেখালেখি করতে চাই, লেখক হতে চাই, মৌলিক কোনোকিছু সৃষ্টি করতে চাই, আমাদের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা ভীষণভাবে সত্য। চিন্তার প্রসারতা না থাকলে, ভাবনায় অভিনবত্ব না থাকলে নতুন কোনোকিছুই আমরা লিখতে পারবো না। লিখতে হয়তো-বা পারবো, কিন্তু তা কতোখানি লেখা হয়ে উঠবে, তা তর্কসাপেক্ষ।

কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা নাযিল করেছেন। এরপর দেখুন, সেই কুরআনকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে লেখা হয়েছে আরো কতো হাজার হাজার গ্রন্থ, তাফসির। একেক তাফসিরের একেক স্বাদ। একেকটা খুলে দেয় ভাবনার একেক দুয়ার। চিন্তার ভিন্নতার এবং নিজস্বতার মূল ব্যাপার এটাই। স্বকীয়তা জিনিসটার বৈশিষ্ট্যই হলো এই।

বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ-দিবস। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে এতো সুন্দর আর চমৎকার গল্প যে লেখা যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ গল্পটা না পড়লে তা আমার অজানাই থেকে যেতো। এটা নিয়ে অনেক প্রবন্ধ, অনেক কবিতা হয়তো লেখা যায়, কিন্তু এটা নিয়ে এতো সকরুণ গল্পও যে হতে পারে, একজন লেখক এতো কমন একটা বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে সমাজের একটা চিরাচরিত রূপ আঁকতে পারে, তা জানার জন্য গল্পটা একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

মানিক বন্দোপাধ্যায় তার তার বিখ্যাত ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটা শেষ করেছেন এভাবে-

‘কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্ৰহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচি পৃথিবীতে আসিয়াছে এবং যে অন্ধকার তাহারা সস্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক। পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবেও না’।

আগাগোড়া একটা গল্পকে মানিক এই লাইন ক’টির মধ্যে এমন নিপুণ, নিঁখুতভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন যে, মনোযোগি পাঠক মাত্রই এই ভাবনার গভীরতা আঁচ করতে পারবেন সহজেই।

নিজস্বতার উদাহরণ টানতে গেলে এরকম আরো বহু বহু কথা বলা যাবে। পৃথিবীতে লেখক হয়ে যারাই টিকে আছে, যাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আজও পাঠকেরা কথা বলে, মুগ্ধ হয়, বিভোর হয়ে ডুবে থাকে তাদের সাহিত্যের পাতায়, তারা প্রত্যেকের ছিলো আলাদা চিন্তা, আলাদা ভাবনার জায়গা। সেই জায়গাগুলো তারা চিনেছেন, এবং নিবিড় যত্নে তাকে প্রস্ফুটিত করেছেন বলেই আজ আমরা ইতিহাসের পাতায়, সাহিত্যের জগতে তাদের নাম দেখতে পাই।

সুতরাং, লেখক হতে হলে, অতি-অবশ্যই ভিন্নভাবে, নতুন আঙ্গিকে, নতুন ধারায় চিন্তা করতে পারতে হবে। সবাই যেভাবে ভাবে, সবাই যেভাবে দেখে, তারচেয়ে আলাদা, তারচেয়ে ভিন্নরকম করে ভাবতে পারলে জন্ম দেওয়া যায় নতুন উপাখ্যান, নতুন গল্পের। সেই গল্পের কারিগর যিনি, তাকেই তো আমরা লেখক বলি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *