শুদ্ধতার পরশমণি

(১)
ফুটপাতে বসে এক তরুণী ফুল কুড়াচ্ছে- এই দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু আমি বর্তমানে সেটাই দেখছি আর শুধুই যে দেখছি তা না বেশ উপভোগও করছি। আশেপাশের মানুষজনও ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে বার বার। কিন্তু তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। আর এই কাজ যে সে প্রায়শই করে থাকে সেটাও ঢের বোঝা যায় তার নির্লিপ্ততা দেখে। তবে আমি তাকে দেখে এখন আর খুব একটা অবাক হচ্ছি না। একটু আগে সে যখন রিকশা থামিয়ে রিকশাওয়ালাকে নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা- বিস্কুট খেলো; তখন বরং কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। আমাদের দেশে রিকশাওয়ালাকে এতটা সম্মানের চোখেও দেখা হয় না!


“এই গরমের মধ্যেও তোমার চা খাওয়া চাইই চাই আপান!” হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে ফ্যানের ঠিক নিচ বরাবর দাঁড়ালো আনিকা। ফ্যানের বাতাসের উপর ভরসা করতে না পেরে নিজের ওড়না দিয়ে ক্রমাগত বাতাস করতে থাকলো। ডাবল সেফটি!


“আমার চা পানে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য কী শাস্তি নিবি সেটা আগে বল,” ভ্রু কুঁচকে চায়ে চুমুক দিয়ে কথাটা বললাম আমি।
ফ্যানের নিচ থেকে সরে চেয়ার টেনে সামনে এসে বসল আনিকা। ঠোঁট উল্টে কান্না করার ভঙ্গি করে বলল, “আমাকে মাফ করে দিন জাহাঁপনা। কোনো শাস্তি দিবেন না প্লিজ। নিরীহ বাচ্চা আমি!!”


কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখ করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। কিন্তু ওর মুখের অবস্থা দেখে আর না হেসে পারলাম না। আমি ফিক করে হেসে দিতে আনিকাও হেসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। হঠাৎ ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম আমি। হঠাৎ করে লাফিয়ে ওঠায় চা ছলকে গায়েও পড়ল খানিক, সাথে আনিকাও ছিটকে দূরে চলে গেল।


“ধুর! চলে গেছে,” বেশ শান্ত ভঙ্গিতে পাশের টেবিলটাতে চায়ের কাপটা রাখলাম।


এদিকে আনিকা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওভাবে ওকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাই তুললাম আমি, “তোর জন্য আমি একটা ইন্টারেস্টিং সিন মিস করলাম। তোর শাস্তি আরও বাড়ানো হবে।”


“ক্ ক…।”
প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতেই ওকে চুপ করিয়ে দিলাম, “খালামণি যদি জানে তুই এখনও বাইরে থেকে এসে ফ্রেশ হোসনি; তাহলে কী হবে ভেবে দেখ।”


সাবধানবাণী করতে দেরি কিন্তু তার বাথরুমের দিকে ছুটতে দেরি না। আমি দ্বিতীয়বারের মত হেসে ফেললাম।


(২)
“আপান দেখো- কোঁকড়া চুলের যত্নের জন্য কত সুন্দর টিপস। তুমি তো সেদিন খুঁজছিলে তাই না?”


আগ্রহ নিয়ে ফোনটা হাতে দিলাম। আসলেই এগুলো জানা ছিল না আমার। ওকে ফোনটা দিয়ে স্টোরিটা আমাকে শেয়ার করতে বললাম। ওকে ফোন ফিরিয়ে দিতেই ও বলতে শুরু করল, “এই আপুটা যে কত্ত চমৎকার তুমি জানো না! জীবনকে, নিজেকে, নিজের আশেপাশের মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয় আপুর মত এত সুন্দর করে বোধ হয় কেউ পারে না! আর সবথেকে মজার ব্যাপার হলো আপু আমাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। নতুন এসেছে।”


আমি হেসে ফেললাম। আনিকার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে থেমে থেমে কথা বলতো আর এর মাঝে আমাকে বেশ কয়েকবার প্রশ্নও করতে হতো। কিন্তু ওর বেলাতে ও আপনাতেই সব বলে দিল।


সেদিন বিকেলে আনিকা আমাকে বেশ জোর করেছিল সেই মেয়েটার সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে বাড়িতে ফিরে যেতে হয়। পরেরবার এসে অবশ্যই দেখা করব কথা দিয়ে আমি চলে আসলাম।


(৩)
পরেরবার খালামণির বাসায় গিয়ে আমি কিন্তু বেমালুম ভুলে গেলাম সে কথা। কিন্তু আনিকা তো আর ভোলেনি! সে ঠিক ঠিক আমাকে নিয়ে দেখা করতে গেল তার প্রিয় আপুর সাথে। ফ্ল্যাটে পা দিয়েই আমি না চমকে পারলাম না। এখানে যে থাকে তার রুচি যে চমৎকার- এটা আলাদা করে বলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই।


বইপোকা হওয়ার কারণে অচেনা কোথাও গেলে সাথে করে একটা বই নিয়ে যাওয়া আমার অভ্যাস। এখানে আসার আগেও একটা বই এনেছি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এখানে এসে আনিকা আর ওর প্রিয় অনামিকা আপু গল্প জুড়ে দিবে। কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। বরং আনিকার থেকে তার আমার প্রতি আকর্ষণটা বেশি আর আমার এই মুহূর্তে তার প্রতি। কেননা এটাই সেই মেয়ে, যাকে আমি সেদিন বিকেলে ফুল কুড়াতে দেখেছি! আমাদের সামনে খাবার রেখে আমার সোজাসুজি এসে বসল সে। বেশ সহজ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, “এই বইটা আমি কবে থেকে খুঁজছি জানো! কোথা থেকে পেলে তুমি এই বই?”


এরপর বেশ কিছুক্ষণ বই নিয়ে আলাপ করে ঠিকানাটা টুকে দিয়ে আসলাম। সেই থেকে শুরু। এরপর খালামণির বাসায় গেলে ঘন্টাখানেক ওর সাথে আড্ডা দেওয়া যেন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। আনিকা যেদিন আমাকে ওর নাম বলেছিল আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, “তোর নামের সাথে তো ভালোই মিল আছে তোর আপুর নামের।”


উত্তরে আনিকা বলেছিল, “নাম আমার সাথে মিললেও স্বভাব তোমার সাথে মেলে।”


আমি সেদিন খুব একটা পাত্তা দেইনি ওর কথা। কিন্তু এখন বেশ বুঝি কথাটা কতখানি সত্যি। অনামিকার সাথে আমার এত মিল যে আমি নিজেও অবাক হয়ে যাই মাঝে মাঝে। নিজের মতো একজনকে পেয়ে আমি বেশ খুশিই ছিলাম।


(৪)


ততদিনে আমি ওর ইনস্টাগ্রাম আইডি বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দেখেছি। ৯৫,০০০ ফলোয়ার ওর আইডিতে। একজন ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার সে। সেখান থেকে ওর চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। ওর সাথে আমার বেশ মেলে, তবে মেলে না একটা জায়গাতেই। যেটা সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ! দ্বীন পালনের আগ্রহ।


একদিন যখন আমরা নিজেদের মধ্যে সেলফ লাভ নিয়ে কথা বলছিলাম তখন আমি ওকে এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার কি সত্যি মনে হয় আমাদেরকে সবার আগে নিজেকে ভালোবাসা উচিত?”


আমি জানি ও কী উত্তর দিবে। আর হলোও তাই। ও সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ অবশ্যই।”


আমি মৃদু হেসে বললাম, “আমি কিন্তু সেটা মনে করি না। আমি মনে করি আমাদের জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ যদি থেকে থাকে- সেটা আমাদের রব্ব। তার আগে কেউ না। আমরা নিজেরাও না।”


ওকে বেশ অপ্রস্তুত দেখায়। একে তো প্রথমবার আমি ওর সাথে কোনোকিছু নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলাম, এরপর হঠাৎ করেই কথার মাঝে ধর্ম নিয়ে আসায় একেবারেই চমকে গেছে বেচারি। কিন্তু সেটা ক্ষণিকের জন্য। দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “নিজেকে ভালোবাসলেই ওসব হবে। এগুলো তো ব্যক্তিস্বাধীনতা। যার ইচ্ছে মানলো, যার ইচ্ছে মানলো না।” সেদিন কিছুটা তর্কযুদ্ধের পর আমি ফিরে এসেছিলাম। এভাবে যখনই সময় পেতাম টুকটাক তর্ক জুড়ে দিতাম।


ওর সাথে পরিচয়ের ৩ মাস পর একদিন আমাকে আর আনিকাকে রাস্তায় দেখল ও। আনিকা দৌড়ে গিয়ে ওর সাথে কথা বলতে লাগলে আমি চুপ করে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর বললাম, “আমাকে তো তুমি খেয়ালই করলে না, অনামিকা!”


চমকে আমার দিকে ফিরে তাকাল সে। আপাদমস্তক কালো বোরকায় আবৃত আমাকে সেদিন খুব একটা ভালোভাবে নেয়নি সে। হয়তো আমাকে সে অন্যরকম ভেবেছিল। একারণেই হোক বা নাসিহা দেওয়ার কারণেই হোক আমাদের বন্ধুত্বটা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে আসে। যোগাযোগ কমে যায়, দূরত্ব তৈরি হয়। তবুও আমি বেশ খোঁজ খবর নিতাম ওর। ওকে হেদায়াতের আলোতে আনার ইচ্ছাটাকে কিছুতেই মাটি চাপা দিতে পারলাম না। চেষ্টা আমি চালিয়েই গেলাম।


(৫)
এভাবে কেটে যায় ৬ টা মাস। একদিন বসে বসে ইনস্টাগ্রামে ওর স্টোরি দেখছিলাম; ঠিক তখনই আনিকা আমাকে ফোন দিল। ফোন ধরার পর আমি যেটা শুনলাম, তার জন্য প্রস্তুতি আমার সত্যিই ছিল না। আমি তখনই বোরকা পরে ছুট লাগালাম খালামণির বাসায়। গিয়ে দেখলাম আমার শুভ্রতা পছন্দ করা বন্ধু শুভ্র সাদায় জড়িয়ে শুয়ে আছে। জীবনে প্রথম আর শেষবারের মত পর্দা করে!
ওর পাশে বসে ছোট বোনটা খুব কাঁদছিল। আমাকে ও বেশ পছন্দ করে। এখানে আমাকে দেখেই দৌঁড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে নেই। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে প্রশ্ন করে, “আপিকে কি অনেক শাস্তি দেওয়া হবে পরশ আপি? কেমন করে সহ্য করবে সে!”


টুকটাক নাসিহা আমি লাবনিকেও দিয়েছিলাম। বড় বোন না বুঝলেও ছোট বোন ঠিকই বুঝেছিল আমার কথার গভীরতা। বোনের পরিণতি ভেবেই মেয়েটা কাঁদতে থাকল অনবরত। আমি ওকে স্বান্তনা দিয়ে বললাম, “আমার শুদ্ধতা চাওয়া বন্ধুকে শুদ্ধতার পরশমণি ছুঁতে না পারলেও তোমাকে তো পেরেছে। এটাই আমার পাওয়া।” বলতে বলতে আমার চোখ থেকেও পানির ধারা নামলো। যার রঙ শুভ্র!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *