স্বরবৃত্ত ছন্দ

ইদানিং জাগরণে অনেক তরুণ লেখালেখি করছেন, এটা খুব আশাব্যঞ্জক। যারা নতুন কবি ও লেখক, তাদের উচিৎ উত্তরোত্তর লেখার মান বৃদ্ধির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। ক্রমাগত প্রচেষ্টা অবশ্যই তাদের সাহিত্যমান বৃদ্ধি করবে, লেখনিকে আরো ঋদ্ধ করবে।

বিশেষত যারা কবিতা লিখছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি- কবিতা নিছক আবেগের বিষয় নয়। এর কিছু ব্যাকরণ আছে, কিছু কলাকৌশল আছে। সেগুলো আয়ত্ত করতে পারলে দেখবেন- আপনার আবেগকে আরো হৃদয়গ্রাহী করে শব্দে-বাক্যে ফুটিয়ে তুলতে পারছেন।

এটা একদিনে হয় না। এর জন্য দীর্ঘ প্রচেষ্টার প্রয়োজন, সাধনার প্রয়োজন। এজন্যই কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে লিখেছেন: সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।

কবিতার অন্যতম ব্যাকরন হল ‘ছন্দ’। কবি আল মাহমুদ প্রায়ই বলতেন: ‘যে ছন্দ জানে না, সে কবি নয়।’ এটাই শাশ্বত সত্য। আপনি যদি গদ্যকবিতাও লিখেন, তবু ছন্দ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। নইলে ভালো কবিতা বের হবে না। (কেন হবে না- সেটা অন্য পর্বে আলোচনা হবে)

তাই এ লেখায় আমি ছন্দ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। উদাহরণ হিসেবে জাগরণে সাম্প্রতিক প্রকাশিত কবিতাসমূহ উল্লেখ করব, যাতে বোঝার সুবিধা হয়। তবে উপযুক্ত উদাহরণ পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে প্রচলিত জনপ্রিয় কবিতা থেকে দৃষ্টান্ত দেব।

প্রথমেই বলে রাখি, ছন্দ সম্পর্কে একটা প্রচলিত ভুল ধারনা আছে। অনেকে মনে করে- ছন্দ মানে ‘বাক্যের শেষ অক্ষরসমূহের মিল’। জ্বী না, এটা আসলে ছন্দ নয়। এটা মূলত অন্ত্যমিল/অনুপ্রাস। সেটা আরেকদিন আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

তাহলে মনে প্রশ্ন জাগে- ছন্দ কী?
– ছন্দ মানে ‘মাত্রার সমতা।

এরপর প্রশ্ন জাগে- মাত্রা কী?
– মাত্রা হল অক্ষরের একক। অক্ষর গণনার জন্য মাত্রা ব্যবহৃত হয়।

পরবর্তী প্রশ্ন- অক্ষর কী?
– অক্ষর নিয়েও একটি ভুল ধারণা বিদ্যমান আছে। অনেকে মনে করে অক্ষর মানে বর্ণ (letter)। আসলে অক্ষর মানে শব্দের ক্ষুদ্রতম অংশ যা আর ভাগ করা যায় না, যা একেবারে উচ্চারণ করতে হয়। ইংরেজিতে যাকে আমরা সিলেবল (syllable) বলি।

তাহলে কথাটা দাঁড়ালোঃ কোন কবিতায় অক্ষর বা সিলেবলের মান/সংখ্যা হল মাত্রা। মাত্রার সমতাকে বলে ছন্দ।

বাংলা ভাষায় ছন্দ প্রধানত তিন প্রকারঃ

  • স্বরবৃত্ত
  • মাত্রাবৃত্ত
  • অক্ষরবৃত্ত

এর বাইরেও কিছু প্রকরণ আছে যেমনঃ মুক্তছন্দ, গদ্যছন্দ ইত্যাদি। আজ শুধু স্বরবৃত্ত নিয়ে আলোচনা করব। পরবর্তীতে ছন্দের অন্যান্য প্ৰকরণগুলো নিয়েও লিখব ইনশাল্লাহ।

স্বরবৃত্ত ছন্দের নিয়ম হলঃ এখানে সব অক্ষরের জন্য মাত্রা ১ (এক)। যেমন ‘আমরা’ শব্দটিতে অক্ষর বা সিলেবল (syllable) ২টিঃ ‘আম্’ এবং ‘রা’। তাই স্বরবৃত্তে ‘আমরা’ শব্দটির মাত্রা ১+১=২ (দুই)।

জাগরণের একটি কবিতা দিয়ে উদাহরণ দেই:

মসজিদ হতে মধুর ধ্বনি শীতল করে প্রাণ
কান্নাভেজা জায়নামাজে রবের গুনগান।

(আঁধারে আলোর দিশা: ফাতেমাতুল বুশরা, ১৪/১/২১)

যদি কবিতাটির অক্ষর বা সিলেবল ভাগ করি, তাহলে এরকম হবেঃ

মস্ | জিদ্ | হ | তে || ম | ধুর্ | ধ্ব | নি ||
শী | তল্ | ক | রে || প্রাণ্ –

কান্ | না | ভে | জা || জায়্ | না | মা | জে ||
র | বের্ | গু | ন || গান্ –

প্রত্যেক সিলেবলের মাত্রা ১ ধরে যদি যোগ করিঃ

মস্ | জিদ্ | হ | তে = ১+১+১+১ = ৪
ম | ধুর্ | ধ্ব | নি = ১+১+১+১ = ৪
শী | তল্ | ক | রে = ১+১+১+১ = ৪
প্রাণ্ = ১

তাহলে প্রথম বাক্যে মোট মাত্রা-সংখ্যা : ৪+৪+৪+১
অনুরূপ দ্বিতীয় বাক্যেও মাত্রা-সংখ্যা : ৪+৪+৪+১

আগেই বলেছি ছন্দ মানে ‘মাত্রার সমতা’। উপরের দুটি বাক্যে হুবহু একই রকম মাত্রা বিন্যাস, এটাই মাত্রার সমতা। একারণে কবিতাটি যখন আবৃত্তি করা হয়- শব্দগুলো অনুরণিত হয়, হৃদয়ে ঝংকার তোলে এবং শুনতে ভালো লাগে।

এটা মূলত ৪ (চার) মাত্রার স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতা। প্রশ্ন করতে পারেন- ৪ মাত্রার কেন বললাম?

কবিতাটি আবৃত্তি করার সময় বাক্যে ৪ মাত্রা পরপর আপনাকে সামান্য থামতে হবে। যেমনঃ

মসজিদ হতে‌ || মধুর ধ্বনি || শীতল করে || প্রাণ
কান্নাভেজা || জায়নামাজে || রবের গুন || গান

বাক্যের শেষে একক মাত্রার ‘গান’ ও ‘প্রাণ’ শব্দদুটি আছে, এটাকে বলে অপূর্ণমাত্রা। কবিতার অপূর্ণমাত্রা ছন্দকে পূর্ণতা দেয়। ভালো শোনায়।

আরেকটা কবিতার উদাহরণ দেখি:

এই যে তুমি অবহেলায় কাটাও প্রতিক্ষণ
ঘোর আঁধারে ঘেরা তোমার একলা উদাস মন

(এই যে তুমি: হান্না রহমান, ১৩/১/২১)

কবিতাটির যদি মাত্রা তথা সিলেবল ভাগ করি:

এই | যে | তু | মি || অ | ব | হে | লায়্ ||
কা | টাও | প্র | তি || ক্ষণ্ – (৪+৪+৪+১)

ঘোর্ | আঁ | ধা | রে || ঘে | রা | তো | মার্ ||
এক্ | লা | উ | দাস্ || মন্ – (৪+৪+৪+১)

দেখা যাচ্ছে এটিও ৪ (চার) মাত্রার স্বরবৃত্ত কবিতা। অনুরূপ মাত্রার আরেকটি স্বরবৃত্ত কবিতাংশ :

সব পেয়েও রবকে যারা পায়নি খুঁজে ভাই
তাদের মতো জনম দুঃখী অন্য কেহ নাই।

(হিসাব দেখো কোষে: রাবেয়া আক্তার রুবি, ১২/১/২১)

সব্ | পে | য়ে | ও || রব্ | কে | যা | রা ||
পায়্ | নি | খুঁ | জে‌‌ || ভাই – (৪+৪+৪+১)

তা | দের্ | ম | তো || জ | নম্ | দুঃ | খী ||
অন্ | ন | কে | হ || নাই – (৪+৪+৪+১)

এই পর্যায়ে এসে নিশ্চয়ই আপনার মনের মধ্যে দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে-

১. স্বরবৃত্ত কবিতা কি সবসময় ৪ (চার) মাত্রার হবে?
২. অপূর্ণমাত্রা কি সবসময় ১ (এক) হতে হবে?

উভয়টির উত্তর হলঃ না। এটা আবশ্যক নয়।

চার মাত্রার স্বরবৃত্ত কবিতা বেশি সহজ, শ্রুতিমধুর এবং জনপ্রিয়। তবে ৪ মাত্রা ছাড়াও হতে পারে। উদাহরণঃ নজরুলের ‘লিচু চোর’ ছড়াটি ৩ মাত্রার (অপূর্নমাত্রা ১)।

বা | বু | দের্ || তাল্ | পু | কু || রে (৩+৩+১)
হা | বু | দের্ || ডাল্ | কু | কু || রে (৩+৩+১)
সে | কি | বাস্ || কর্ | লে | তা || ড়া (৩+৩+১)
ব | লি | থাম্ || এক্ | টু | দাঁ || ড়া (৩+৩+১)

অপূর্নমাত্রা ১/২/৩/০ হতে পারে, এমনকি সমতা নাও থাকতে পারে। তাতে স্বরবৃত্ত ছন্দের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয় না। যেমন:

এখন আমার || বুকের মাঝে || ভয় (৪+৪+১)
পাপাচারে || লিপ্ত মনে || ক্ষত (৪+৪+২)
রাত্রি এলে || রোজই এখন || ভাবি (৪+৪+২)
এবার ঠিকই || হব অনু || গত (৪+৪+২)

(একটুকু ঠাঁই দিও: রুকাইয়া মাবরুরা, ১৩/১/২১)

এখানে প্রথম বাক্যে অপূর্নমাত্রা ১ (এক), কিন্তু অন্য বাক্যগুলোর অপূর্নমাত্রা ২ (দুই)।

অবশ্য অপূর্ণমাত্রা থাকতেই হবে এমন কোন কথা নেই। অপূর্ণমাত্রা ছাড়াও ভালো ছড়া/কবিতা হতে পারে। সেটা কবির দক্ষতার উপর নির্ভর করে। যেমন:

ব্যথারা সব তরল রূপে চোখের তারায় জল গড়ালো
সেই জলেরা ফোঁটায় ফোঁটায়‌ নামলো বেয়ে কপোল ছুঁয়ে
সেই জলেরা বর্ণে, শব্দে‌, ব্যাকুল ছন্দে কাব্য হলো,
আমার বড়ো কান্না পেলো ঝনঝনিয়ে!

(মায়াকাব্য: জান্নাত মিম, ১৬/১২/২০)

যদি এই কবিতাংশের মাত্রাবিন্যাস করি, দেখা যায় এখানে কোন অপূর্ণমাত্রা নেই।

ব্যথারা সব || তরল রূপে (৪+৪)
চোখের তারায় || জল গড়ালো (৪+৪)
সেই জলেরা || ফোঁটায় ফোঁটায় (৪+৪)
নামলো বেয়ে || কপোল ছুঁয়ে (৪+৪)
সেই জলেরা || বর্ণে শব্দে (৪+৪)
ব্যাকুল ছন্দে || কাব্য হলো (৪+৪)
আমার বড়ো || কান্না পেলো (৪+৪)
ঝনঝনিয়ে! (৪)

উল্লেখ্য, এখানে যাদের কবিতা উল্লেখ করছি- তারা কেউ কেউ ছন্দ জেনে লিখেছেন, ফলে কবিতাগুলো সুখপাঠ্য হয়েছে। আবার কেউ কেউ ছন্দ না জেনেও লিখেছেন। তাদের কবিতার কিছু অংশ অবচেতনে ছন্দোবদ্ধ হয়ে গেছে, সেটা ভাল শোনাচ্ছে। তবে পরের পংক্তিতে গিয়ে যখন ছন্দপতন হচ্ছে, তখন আবৃত্তি আটকে যাচ্ছে।

এটাই স্বরবৃত্তের মজা, এটাই স্বরবৃত্তের নৈর্ব্যক্তিকতা।

4 Comments

  1. মা শা আল্লাহ! খুবই গঠনমূলক এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

  2. মাশাআল্লাহ! অসাধারণ গোছালো একটা লেখা। কবিতার ব্যকরণ নিয়ে বিগিনারদের জন্য এমন গোছালো লেখা খুব কমই আছে।
    পরবর্তী পর্বগুলোর অপেক্ষায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *